Diabetics
|

ডায়াবেটিস হলে কি কি সমস্যা হয়?

বাংলাদেশে ডায়াবেটিস এখন একটি খুবই সাধারণ কিন্তু গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠেছে। আমাদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা, এবং বংশগত কারণের ফলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিস শুধু একটি রোগ নয়, এটি এক ধরণের নীরব ঘাতক, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। অনেকেই ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন নন, কিংবা এটিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সময়মতো সচেতন না হলে এই রোগ আমাদের শরীরের ওপর মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই আজ আমরা সহজ ভাষায় আলোচনা করব—ডায়াবেটিস কী, এটি হলে কী কী সমস্যা হয়, এবং কীভাবে আমরা এটি প্রতিরোধ করতে পারি।

ডায়াবেটিস কি?

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদী (ক্রনিক) রোগ, যা তখন হয় যখন শরীরের ইনসুলিন উৎপাদনে সমস্যা হয় বা শরীর ইনসুলিন ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না। ইনসুলিন হলো একটি হরমোন, যা রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের দেহের কোষগুলো শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহার করে, আর ইনসুলিন সেই গ্লুকোজকে কোষের ভেতরে প্রবেশ করায়। কিন্তু ডায়াবেটিস হলে এই প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়, ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিস মূলত দুই ধরনের—টাইপ ১ এবং টাইপ ২। টাইপ ১ ডায়াবেটিস সাধারণত শিশু ও তরুণদের মধ্যে দেখা যায় এবং এটি তখন হয় যখন শরীর ইনসুলিন তৈরি করতেই পারে না। অন্যদিকে, টাইপ ২ ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এটি মূলত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং বংশগত কারণের ফলে হয়ে থাকে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় কিছু নারীর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হতে পারে, যা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের হার অনেক বেশি, কারণ আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রা প্রায়শই অস্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে। অস্বাস্থ্যকর খাবার, শরীরচর্চার অভাব এবং মানসিক চাপ—এই সবকিছুই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তাই ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রণের উপায় জানা খুবই জরুরি।

ডায়াবেটিস হলে কী কী সমস্যা হয়?

ডায়াবেটিস হলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এটি শুধু রক্তের শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় না, বরং দৃষ্টিশক্তি, কিডনি, হৃদযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্রসহ পুরো শরীরের কার্যক্রম ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় রোগীরা প্রথম দিকে তেমন কোনো লক্ষণ অনুভব করেন না, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ডায়াবেটিস থাকলে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়। নিচে আমরা ডায়াবেটিসের ফলে হওয়া প্রধান সমস্যাগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

১. হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ

ডায়াবেটিস হৃদরোগের অন্যতম বড় কারণ। এটি রক্তনালীগুলোকে কঠিন এবং সরু করে তোলে, ফলে হৃদযন্ত্রে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস হলে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা ধমনীতে চর্বি জমিয়ে হার্টের রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

২. কিডনি সমস্যা (নেফ্রোপ্যাথি)

ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির ছোট ছোট রক্তনালী নষ্ট হয়ে যায়, ফলে কিডনি ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে কিডনি বিকল হতে পারে এবং ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

৩. চক্ষু সমস্যা (রেটিনোপ্যাথি)

ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন অবহেলা করলে চোখের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা রেটিনোপ্যাথির কারণ হতে পারে। এটি দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত অন্ধত্বের কারণও হতে পারে।

৪. স্নায়ুর সমস্যা (নিউরোপ্যাথি)

ডায়াবেটিসের ফলে শরীরের স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পায়ে ব্যথা, ঝিঁঝিঁ ধরা, সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া, এমনকি পায়ের আলসার এবং সংক্রমণের কারণ হতে পারে।

৫. পায়ের সমস্যা ও ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষত শুকাতে অনেক সময় লাগে, কারণ রক্তসঞ্চালন কমে যায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পায়ের ইনফেকশন এতটাই গুরুতর হয়ে যায় যে অঙ্গচ্ছেদ (অ্যাম্পুটেশন) করতে হয়।

৬. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা

ডায়াবেটিস শুধুমাত্র শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করে না, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। রোগীরা প্রায়ই দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও হতাশায় ভোগেন। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হতাশার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

৭. গর্ভকালীন সমস্যা

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি বাড়ে। এটি শিশুর অতিরিক্ত ওজন, প্রিম্যাচিউর জন্ম এবং জন্মকালীন জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই নিয়মিত চেকআপ করাতে হবে।

৮. লিভারের সমস্যা

ডায়াবেটিস থাকলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে, যা ফ্যাটি লিভার ডিজিজের কারণ হতে পারে। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

৯. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া

ডায়াবেটিস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, ফলে রোগীরা সহজেই বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হন। ঠান্ডা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, চর্মরোগ এবং অন্যান্য সংক্রমণ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

১০. ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি

গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিস থাকলে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে লিভার, স্তন, অগ্ন্যাশয় এবং কোলন ক্যানসারের সম্ভাবনা বেশি থাকে।

বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর সমূহ

“কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার তালিকা” এই বিষয়ে আপনার মনে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে? তাহলে চলুন জেনে নেই সেই সকল প্রশ্ন ও উত্তরগুলো-

ডায়াবেটিস কি সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা যায়?

না, ডায়াবেটিস সম্পূর্ণভাবে নিরাময়যোগ্য নয়, তবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ থাকা যায়।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধের সহজ উপায় কী?

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ডায়াবেটিস প্রতিরোধের সহজ উপায়।

উপসংহার

ডায়াবেটিস বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অনুসরণ করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই দেরি না করে এখনই সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *